The Great Flood
- Get link
- X
- Other Apps
তখন আমি আকাশের দরজাগুলো খুলে দিয়ে মুষলধারায় বৃষ্টি বর্ষিয়েছিলাম।
আর যমীন থেকে উৎসারিত করেছিলাম ঝর্ণাধারা,
অতঃপর (সব) পানি মিলিত হল যে পরিমাণ পূর্বেই নির্ধারিত করা হয়েছিল।
মহাপ্লাবন
The Great Flood · Deluge Myth · একটি অনুসন্ধান
একটি বৈশ্বিক স্মৃতি
পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি ভৌগোলিক অঞ্চলের ধর্মীয় ও লৌকিক সংস্কৃতিতে একটি "মহাপ্লাবন" বা The Great Flood-এর বর্ণনা পাওয়া যায়। মিথোলজির ভাষায় একে বলা হয় "Flood Myth" বা "Deluge Myth"। মজার ব্যাপার হলো, একে অপরের থেকে হাজার মাইল দূরে অবস্থিত এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটের সংস্কৃতিগুলোতেও এই কাহিনীর মূল কাঠামো প্রায় একই।
বিশ্বের মহাপ্লাবনের আখ্যানসমূহ
মানুষের অবাধ্যতা ও অত্যধিক শোরগোলে বিরক্ত হয়ে দেবতা এনলিল মানবজাতিকে বন্যায় ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেন। দেবতা "এনকি" গোপনে তাঁর ভক্ত আত্রাহাসিসকে সতর্ক করে একটি নৌকা তৈরির নির্দেশ দেন। আব্রাহামিক ধর্মের নূহ (আ.)-এর সাথে এর মিলটা কি শুধুই কাকতালীয়?
জিউসের ক্রোধে সৃষ্ট মহাপ্লাবন থেকে রক্ষা পেতে ডিউক্যালিয়ন একটি জলযান তৈরি করেন। বন্যার পরে তিনি ও তার স্ত্রী পিররা পর্বতচূড়ায় আশ্রয় পান এবং নতুন মানবজাতির সূচনা করেন।
একটি ছোট মাছ মনুকে আসন্ন মহাপ্লাবনের কথা জানায় এবং তাকে একটি নৌকা তৈরি করতে বলে। সেই মাছই পরে বিশাল আকার ধারণ করে নৌকাটিকে হিমালয়ের চূড়ায় নিয়ে যায়।
সূর্য দেবতা তেজকাটলিপোকার আদেশে মহাপ্লাবন আসে। তাতা ও নেনা দেবতার সতর্কবার্তায় একটি গাছের কাণ্ডে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে যান এবং পরবর্তী সৃষ্টির সূচনা করেন।
নু'উ নামক এক বীর তার পরিবারের জন্য একটি বড় নৌকা তৈরি করেন। বন্যার পর প্রথম যে ভূমি জেগে ওঠে তা ছিল মাউন্ট কেয়ার চূড়া — প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে, সভ্যতার মূল কেন্দ্র থেকে হাজার মাইল দূরে।
প্রাচীন চীনা পুরাণে গুন ও তার পুত্র ইউ মহাপ্লাবন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। এই বন্যার বর্ণনায়ও আকাশ ও পৃথিবী উভয় উৎস থেকে পানি আসার কথা বলা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে ২০০-এরও বেশি সংস্কৃতিতে একটি বড় মহাপ্লাবনের কথা উল্লেখ আছে। এবং এই বর্ণনাগুলোর কাঠামোগত মিল অবাক করার মতো — প্রায় সবগুলোতেই আছে: ঐশী শক্তির অবাধ্যতা, শাস্তি হিসেবে মহাপ্লাবন, একজন মনোনীত মহাপুরুষকে সতর্কবার্তা, একটি জলযান বা অবলম্বন, এবং নির্দিষ্ট কিছু মানুষ ও প্রাণীর বেঁচে ফেরা।
বৈশ্বিক প্লাবন মিথের কাঠামোগত বিশ্লেষণবিজ্ঞান এখানে কী বলছে?
ভূতাত্ত্বিকরা এই প্লাবনের ঘটনার কয়েকটি প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন।
শেষ তুষার যুগ (Ice Age) শেষ হওয়ার সময় বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়েছিল। বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠ প্রায় ১৮,০০০ বছর আগে বর্তমানের চেয়ে প্রায় ১২০ মিটার নিচে ছিল এবং প্রায় ১০,০০০ বছর পর্যন্ত ক্রমশ বাড়তে থাকে।
ভূ-বিজ্ঞানী Ryan ও Pitman-এর গবেষণা অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগরের পানি কৃষ্ণ সাগরের মিষ্টি পানির হ্রদে প্রবাহিত হয়েছিল নায়াগ্রা জলপ্রপাতের ২০০ গুণ বেগে, অন্তত ৩০০ দিন ধরে।
Ballard-এর নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে কৃষ্ণ সাগরের তলদেশে প্রায় ৯৪ মিটার গভীরে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ি, পাথরের হাতিয়ার, মাটির পাত্র এবং প্রাচীন কাদামাটি পাওয়া গেছে।
১৭৫টি ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মহাপ্লাবনের মিথ বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে এগুলোর মধ্যে অনেকগুলোতে "একই সময়ের" একটি মহাজাগতিক ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়।
মনোবিজ্ঞানী কার্ল ইউং-এর "Collective Unconscious" বা সমষ্টিগত অচেতনের তত্ত্ব দিয়ে হয়তো এক অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে চিন্তার সাদৃশ্য ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু তাহলে এফ্রো-এশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে হাজার হাজার বছর ধরে বিচ্ছিন্ন আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের আদিবাসীদের লৌকিক বিশ্বাসেও যখন এই প্লাবনের প্রায় হুবহু বর্ণনা পাওয়া যায় — তখন এর ব্যাখ্যার জন্য এই তত্ত্ব কি যথেষ্ঠ হয়?
কার্ল গুস্তাভ ইউং · Collective Unconscious-এর সীমাযে প্রশ্নের উত্তর নেই
তাদের ভাষ্যমতে এসব বন্যা, প্লাবনের ঘটনারই কালেকটিভ মেমোরি থেকে মানুষ এই মিথগুলো রচনা করেছে, আর আধ্যাত্মিক প্রয়োজনীয়তার খাতিরে "Divine Cleaning" হিসাবে এই ঘটনাকে ব্যবহার করেছে।
কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্নটা ওঠে। মেসোপটেমিয়া বা কৃষ্ণ সাগরের স্থানীয় একটি বন্যার স্মৃতি কীভাবে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী কিংবা আমাজনের গভীর অরণ্যের আদিবাসীদের মৌখিক ঐতিহ্যে প্রায় একইভাবে পৌঁছাল? — এই প্রশ্নের কোনো নির্ভরযোগ্য ধর্মনিরপেক্ষ ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত দেওয়া সম্ভব হয়নি।
আর ভূতাত্ত্বিক প্রমাণের কথা বলতে গেলে — পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতচূড়াগুলোতে সামুদ্রিক জীবাশ্মের উপস্থিতি টেকটনিক প্লেটের নাড়াচাড়া দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব, এটা সত্য। কিন্তু প্রাচীন গ্রিক, মিশরীয় ও রোমানরাও পর্বতে সামুদ্রিক জীবাশ্মের অস্তিত্ব নথিভুক্ত করেছিলেন এবং এটাকে পৃথিবী একসময় পানির নিচে ছিল — এই ধারণার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।
শুধু টেকটনিক মুভমেন্ট নয়, বৈশ্বিক জলরাশির উপস্থিতি ছাড়া এটি ব্যাখ্যা করা কঠিন — এই যুক্তি তাঁরা হাজার বছর আগেই দিয়েছিলেন।
Rational Mind কী বলে?
এখন, যদি মহাপ্লাবন একটি বাস্তব ঐতিহাসিক ঘটনাই হয়, আর বিবর্তনের তত্ত্ব অনুযায়ী পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব যদি লক্ষ বছর হয় এবং যদি মহাপ্লাবন এতটাই ব্যাপক হয় যে পৃথিবীর সকল প্রান্তে এর প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া যায় — তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে: এই বিশ্বব্যাপী মহাপ্লাবন থেকে মানুষের বাঁচা কি আদেও সম্ভব ছিলো? হলেও কিভাবে?
তাহলে, রেশনাল মাইন্ড থেকেও সহজেই অনুমান করা যায় যে কিছু নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষ এবং প্রাণী অবশ্যই এই মহাপ্লাবন সারভাইব করেছে। আর যেই মহাপ্লাবনে সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গ পর্যন্ত ডুবে যায়, সেই প্লাবন থেকে সারভাইব করার জন্য নিশ্চই ঐশী সাহায্য ছাড়া আর কিছুই সাহায্য করতে পারে না।
"অতএব উপদেশ গ্রহণ করার কেউ আছে কি?"
— সূরা আল-ক্বামার, আয়াত ১৫
- Get link
- X
- Other Apps
Comments
Post a Comment